পৃথিবীর গর্ভে আর কতো স্বর্ণ আছে?

Spread the love

বার্তাবহ চাঁদপুর ডেস্ক: পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধাতু হলো স্বর্ণ। স্বর্ণর দাম গত মাসে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছে। স্বর্ণের এই মূল্যবৃদ্ধি পুরনো এক প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। পৃথিবীর গর্ভে আর কতো স্বর্ণ খনন করতে বাকি?

বিনিয়োগ, স্থিতি প্রতীক ও অনেক বৈদ্যুতিক ডিভাইসের মূল উপাদান হিসেবে স্বর্ণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে এটি একটি সীমিত সম্পদ এবং এমন একটা সময় আসবে যখন খননের জন্য আর কোনো স্বর্ণ অবশিষ্ট থাকবে না।

পিক গোল্ড হলো সেই সময়, যখন স্বর্ণর বিশ্বব্যাপী উত্তোলন সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। হুবার্ট পিক থিওরি অনুযায়ী, শিখরের পরে শূন্যে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত উত্পাদনের হার কমতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা পিক গোল্ড ধারণা সম্পর্কে বলেন, যখন আমরা কোনো এক বছরে সবচেয়ে বেশি উত্তোলন করতে পারি। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে আমরা এরই মধ্যে এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল অনুসারে, ২০১৯ সালে খনি থেকে স্বর্ণের উত্পাদন হয়েছে ৩ হাজার ৫৩১ টন, যা ২০১৮ সালের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ কম। এটা ২০০৮ সালের পর উত্পাদনের প্রথম বার্ষিক হ্রাস।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের একজন মুখপাত্র হ্যানাহ ব্র্যান্ডস্টেটর বলেন, বিদ্যমান মজুদগুলো সঙ্কুচিত হওয়ায় এবং নতুন বড় আবিষ্কার খুব বিরল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সামনের বছরগুলোতে খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর গতির বা হ্রাস পেতে পারে।

এমনকি যখন পিক গোল্ড ঘটে, তার কয়েক বছরের মধ্যে এটির উত্পাদন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং আমরা কয়েক দশক ধরে উত্পাদন ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে দেখবো।

মেটাল ডেইলি ডটকমের রস নরম্যান বলেন, খনি থেকে উত্পাদন রেখা ভূমির সমান্তরাল এবং সম্ভবত উত্পাদন ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে সেটা নাটকীয়ভাবে ঘটবে না।

খনন সংস্থাগুলো দুই উপায়ে ভূ-অভ্যন্তরে থাকা স্বর্ণর পরিমান অনুমান করে থাকে। একটা হলো রিজার্ভ। অর্থাৎ বর্তমান বাজার মূল্যের তুলনায় খনি থেকে লাভজনকভাবে উত্তোলনযোগ্য স্বর্ণ। আরেকটি হলো রিসোর্স। অর্থাৎ আরো পর্যবেক্ষণের পর বা সম্ভাব্য উচ্চমূল্য স্তরে লাভজনকভাবে খনি থেকে উত্তোলনযোগ্য স্বর্ণ। স্বর্ণের রিজার্ভের পরিমাণ রিসোর্সের তুলনায় আরো নির্ভুলভাবে গণনা করা যেতে পারে, যদিও কাজটি সহজ নয়।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জপির অনুসারে, বর্তমানে ভূ-অভ্যন্তরে স্বর্ণের মজুদের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার টন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিসাব করলে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৯০ হাজার টন স্বর্ণ খনন করা হয়েছে। যদিও আনুমানিক এ হিসাবের পরিমাণে ভিন্নতা রয়েছে। এই গড়পড়তা পরিসংখ্যান অনুসারে, ভূগর্ভের মোট স্বর্ণের আর প্রায় ২০ শতাংশ স্বর্ণ খনন করা বাকি রয়েছে।

তবে এটা একটি চলমান ও পরিবর্তনশীল হিসাব। নতুন প্রযুক্তি এমন কিছু জ্ঞাত মজুদ থেকে উত্তোলন করা সম্ভব করতে পারে, যা হয়তো বর্তমান বাজারের তুলনায় উত্তোলন লাভজনক নয়। সাম্প্রতিক উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিগ ডাটা, এআই ও স্মার্ট ডাটা মাইনিং। যা সম্ভাব্য প্রক্রিয়াগুলো অনুকূল করতে ও ব্যয় হ্রাস করতে পারে। এরই মধ্যে কয়েকটি খনন সাইটে রোবট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে, খনি অনুসন্ধানে এটি আদর্শ প্রযুক্তি হয়ে উঠবে।

স্বর্ণের ইতিহাসের বৃহত্তম একক উত্স হলো দক্ষিণ আফ্রিকার উইট ওয়াটার্স র‌্যান্ড বেসিন। পৃথিবীর খননকৃত স্বর্ণর ৩০ শতাংশই এখানকার। স্বর্ণের অন্যান্য প্রধান উৎসের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার অত্যন্ত গভীর এমপোনেগ খনি, অস্ট্রেলিয়ার সুপার পিট ও নিউমন্ট বোডিংটন খনি, ইন্দোনেশিয়ার গ্রাসবার্গ খনি ও যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা খনি।

বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ খননকারী হলো চীন। অন্যদিকে কানাডা, রাশিয়া ও পেরু প্রধান উত্পাদক। সংস্থানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যারিক গোল্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন নেভাডা গোল্ড মাইন বিশ্বের একক বৃহত্তম স্বর্ণ খনি কমপ্লেক্স। সংস্থাটি বছরে প্রায় ৯৯ দশমিক ২২ টন স্বর্ণ উত্পাদন করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও নতুন স্বর্ণর খনি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তবুও বড় আকারের মুজদ থাকা স্বর্ণ খনিগুলো বিরল হয়ে উঠছে। ফলস্বরূপ, বেশিরভাগ স্বর্ণের উত্পাদন বর্তমানে পুরনো খনিগুলো থেকে আসে, যা কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ভূগর্ভস্থ স্বর্ণের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হলেও এটির স্বর্ণের একমাত্র উত্স নয়। পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদেও স্বর্ণ আছে। কিন্তু চাঁদে স্বর্ণের খনন ও সেটা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ব্যয় স্বর্ণের দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।

মহাকাশ বিশেষজ্ঞ সিনিয়াদ ও সুলিভান বলেন, চাঁদে স্বর্ণ থাকলেও তা খনন করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক হবে না। এটি বিক্রি করে আপনি যে অর্থ পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ সেটা খননের পেছনে ব্যয় করতে হবে।

একইভাবে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে থাকা স্বর্ণ খনন করাও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। সমুদ্রতলেও স্বর্ণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তবে সেগুলো খনন ব্যয়ের কারণে মানুষের অধরাই থেকে যাচ্ছে। আর স্বর্ণের একটি ফ্যাক্টর হলো এটা তেলের মতো নয়, বরং এটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য। সুতরাং আমরা কখনোই একেবারে স্বর্ণ শেষ হতে দেখবো না, এমনকি খনন বন্ধ হয়ে গেলেও।

সেলফোনের মতো বৈদ্যুতিক ডিভাইসে প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি সেলফোনে গড়ে কয়েক পাউন্ড মূল্যমানের স্বর্ণ থাকে। এরই মধ্যে বৈদ্যুতিক বর্জ্য থেকে আহরিত স্বর্ণ পুনর্ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। সে উদ্যোগ অনেকখানি সফলও।

সুত্রঃ বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *