যানজট নিরসনে ইসলামের নির্দেশনা

Spread the love

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা   

দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরায় প্রায়ই যানজটের সম্মুখীন হতে হয়। এতে সময় নষ্ট ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ হয়। যানজট নিরসনে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন চলছে। সেই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিক সজাগ ও সচেতন হলে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে নিম্নে বর্ণিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।

দায়িত্ব সচেতন হওয়া : সবাই দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হলে সমাজ-জীবনের শৃঙ্খলা অনেক অটুট ও সুন্দর হবে। প্রায়ই দেখা যায়, অনেকেই রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে রাখে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ফুটপাতগুলো দখল করে রাখে। এতে মূল রাস্তায় চাপ বেশি পড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। সবার মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থাকলে এমন হতো না। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’। (বুখারি, হাদিস : ৮৫৩; মুসলিম, হাদিস : ৪৮২৮)

অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া : অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা যানজট অনেকাংশে কমিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে। অযথা ওভারটেকিং বন্ধ হতে পারে। কারণ তাড়াহুড়া আর আগে যাওয়ার চেষ্টা থেকেই যানজট সৃষ্টি হয়। একে অন্যের প্রতি সহনশীল ও কল্যাণকামী হলে অন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে পথ চলা সহজ হয়। এটিই ইসলামের শিক্ষা। ‘দ্বিন মানেই হলো নসিহত বা কল্যাণকামিতা’। (মুসলিম, হাদিস : ২০৫)

এ ছাড়া অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রসঙ্গে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তারা তাদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।’ (সুরা হাশর, আয়াত, ৯)

রাস্তা সচল ও পরিষ্কার রাখা : রাস্তা সচল ও পরিষ্কার রাখা ঈমানের অংশ। কাজেই রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী রাখা বা ময়লা-আবর্জনা ফেলা ঈমানের দাবি নয়; বরং ঈমানের দাবি হলো, রাস্তা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখা। কোনোভাবেই রাস্তা বন্ধ না করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “ঈমানের সত্তরের বেশি শাখা রয়েছে। সর্বোত্তম শাখা হলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হলো, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলা।” (মুসলিম, হাদিস : ১৬২)

বিলাসিতা পরিহার করা : অপচয় ও অযথা ব্যয় করা অবাঞ্ছিত আচরণ। অপচয় ও অযথা ব্যয় থেকে বিলাসিতা তৈরি হয়। তখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অথবা অপ্রয়োজনে গাড়ি কেনা হয়। গাড়ির আধিক্যের কারণেও যানজট সৃষ্টি হয়। গাড়ি ক্রয় ও ব্যবহারে অপচয় ও অযথা ব্যয় পরিহার করে যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘এবং আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)

আল্লাহ আরো বলেন, ‘আর কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬-২৭)

বরাদ্দের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা : অনেক সময় রাস্তাঘাট নির্মাণে সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার হয় না। নির্মাণকাজে তুলনামূলক কমদামি সামগ্রী ব্যবহার করার ফলে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়। আবার মেরামত করতে রাস্তা বন্ধ করতে হয়। মেরামত না হলে ভাঙা পথ পাড়ি দিতে সময় নষ্ট হয়। এসব কারণেও যানজট সৃষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দের যথার্থ ব্যবহার করা হলে রাস্তাঘাট সুন্দরভাবে নির্মিত হতো। সুন্দর চলাচলব্যবস্থার সুযোগ হলে যানজট অনেকাংশে কমে যেত। সরকারি বরাদ্দের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ইউসুফ (আ.) বলেছিলেন, ‘আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও সুবিজ্ঞ।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৫৫)

ইসলাম মানবজাতির ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ ও মুক্তির জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধচর্চা সব ক্ষেত্রেই এভাবে সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে পারে। প্রয়োজন শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধ লালন, ধারণ ও পালন করা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সুত্রঃ কালেরকণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *